বিশ্ববাজারে তৈরি পোশাকের পাশাপাশি বিকল্প রফতানিকারক খাত হয়ে উঠতে পারে সিরামিক শিল্প। বর্তমানে দেশে সিরামিক টেবিলওয়্যার, টাইলস ও স্যানিটারিওয়্যারের ৭০টির বেশি শিল্প-কারখানা রয়েছে। স্থানীয় বাজারে বছরে প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকার সিরামিক পণ্য বিক্রি হয়। গত ১০ বছরে সিরামিক খাতে উৎপাদন ও বিনিয়োগ বেড়েছে প্রায় ১৫০ শতাংশ। দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিশ্বের অর্ধশতাধিক দেশে রফতানি হচ্ছে সিরামিক সামগ্রী। যেখানে বছরে আয় প্রায় ৫০০ কোটি টাকা। এ শিল্পে রফতানির পাশাপাশি বাড়ছে দেশী-বিদেশী বিনিয়োগও। সিরামিক খাতের বড় উৎপাদনকারী দেশ চীন ও ভারতসহ বিভিন্ন দেশ বাংলাদেশে বিনিয়োগে আগ্রহী। এ শিল্পে প্রায় ১৮ হাজার কোটি টাকার অধিক বিনিয়োগ রয়েছে। এখানে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় পাঁচ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে।
রাজধানীর আন্তর্জাতিক কনভেনশন সেন্টার, বসুন্ধরায় (আইসিসিবি) গতকাল চতুর্থবারের মতো আয়োজিত সিরামিক এক্সপোর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এ খাতের ব্যবসায়ীদের বক্তব্যে এ তথ্য উঠে আসে। দেশের সিরামিক শিল্পকে বিশ্ববাজারে তুলে ধরতে চার দিনব্যাপী আন্তর্জাতিক এ প্রদর্শনীর আয়োজন করেছে বাংলাদেশ সিরামিক ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিসিএমইএ)।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন। তিনি বলেন, ‘একটা সময় শতভাগ আমদানিনির্ভর সিরামিক শিল্প আজ বিশ্ব দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে। এ শিল্পের বিকাশে প্রযুক্তির সর্বোচ্চ প্রয়োগ নিশ্চিত করা জরুরি। এছাড়া উৎপাদন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে প্রয়োজন নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি।’
শেখ বশিরউদ্দীন বলেন, ‘সিরামিক শিল্পের জন্য দেশে উৎপাদিত কোনো কাঁচামাল নেই। তাহলে এ শিল্পকে কীভাবে বড় করব? আমরা কী সুবিধা কাজে লাগাব? আমাদের মানবসম্পদের দক্ষতা, লজিস্টিক, ইউটিলিটি এবং পশ্চাৎ শিল্প ও সম্মুখ সারির ইন্টিগ্রেশন কাজে লাগাতে হবে।’
বাণিজ্য উপদেষ্টা আরো বলেন, ‘এ খাতে কর, সম্পূরক শুল্ক ও মূল্য সংযোজন কর বেশি, তা ঠিক। কিন্তু দেশে কয়টি শিল্প নিয়ম মেনে চলার উদাহরণ দেখাতে পারে, সেটাও বিবেচনা করা প্রয়োজন। শিল্পগুলো যদি দায়িত্বশীল হয়ে কর পরিশোধ করে ও নিয়ম মেনে চলতে পারে, তাহলে সরকার এ খাতে কর হ্রাসের বিষয়টি বিবেচনা করবে।’
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) ভাইস চেয়ারম্যান হাসান আরিফ বলেন, ‘সিরামিক শিল্প দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণের পাশাপাশি রফতানিতেও সম্ভাবনা তৈরি করেছে।’ তার ভাষায়, গত বছর প্রায় ৩৫ মিলিয়ন ডলারের সিরামিক পণ্য রফতানি করেছে বাংলাদেশ, যা খাতটির ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার দিকটি পরিষ্কার করে।
পোশাকের পাশাপাশি সিরামিক শিল্পের বিকাশকে ইতিবাচক উল্লেখ করে বাংলাদেশে নিযুক্ত ইতালির রাষ্ট্রদূত আন্তোনিও আলেসান্দ্রো বলেন, ‘সাম্প্রতিক বছরগুলোয় বাংলাদেশ সিরামিক শিল্প উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। তৈরি পোশাকের বাইরে নতুন একটি শক্ত খাত হিসেবে সিরামিকের বিকাশ ইতিবাচক দৃষ্টান্ত হবে।’
সিরামিক খাতের উন্নয়নে সরকারের প্রতি কর কমানোর আহ্বান জানিয়ে বিসিএমইএর সভাপতি মাইনুল ইসলাম বলেন, ‘ইতালিতে সিরামিক পণ্যের বাজার ১ বিলিয়ন থেকে বাড়িয়ে ২ বিলিয়ন ইউরো নির্ধারণ করা হয়েছে। এ লক্ষ্যে এই খাতে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কর কমানো হয়েছে। বাংলাদেশ সরকারকেও সিরামিক শিল্পের জন্য এমন উদ্যোগ বিবেচনা করতে হবে।’
অনুষ্ঠানে আরো উপস্থিত ছিলেন বিসিএমইএর জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি মামুনুর রশীদ ও আব্দুল হাকিম সুমন, ফেয়ার কমিটির চেয়ারম্যান ইরফান উদ্দীনসহ দেশী-বিদেশী ব্যবসায়ীরা।
এবারের সিরামিক এক্সপোয় বাংলাদেশসহ বিশ্বের ২৫টি দেশের ১৩৫টি প্রতিষ্ঠানসহ ৩০০টি ব্র্যান্ড অংশ নিচ্ছে। এ মেলায় অংশ নিতে বাংলাদেশে এসেছেন ৫০০ আন্তর্জাতিক প্রতিনিধি ও বায়ারস। প্রদর্শনীতে ফ্লোর টাইলস, রুফ টাইলস, ওয়াল টাইলস, স্যানিটেশন টাইলসসহ গৃহস্থালি, নির্মাণ ও অন্যান্য সিরামিক পণ্য নিয়ে হাজির হয়েছে ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানগুলো। তবে প্রদর্শনীতে বিক্রির সুযোগ না থাকলেও ক্রেতাদের অর্ডার করার সুযোগ রয়েছে। আর বেশি পণ্যের অর্ডারে মিলছে অফারও।
মেলায় অংশ নেয়া শাইনপুকুর সিরামিকস লিমিটেডের উপব্যবস্থাপক রওনক ইসলাম টুটুল বলেন, ‘শাইনপুকুর অনেক বছর ধরে বাংলাদেশে স্থানীয় পর্যায়ে সিরামিক পণ্য বিক্রির পাশাপাশি রফতানি করছে। এ প্রদর্শনীতে ব্যাপক সাড়া পাওয়া যাচ্ছে। দেশী-বিদেশী ব্যবসায়ীদের মধ্যে ব্যবসায়িক বিনিময়ের সুযোগ তৈরি হয়েছে।’
র্যাক সিরামিক ব্র্যান্ডের সহকারী ব্যবস্থাপক আরেফিন হাসিব বলেন, ‘সিরামিক পণ্যের ব্যবহার ও ব্যবসা দুটিই বাড়ছে। প্রদর্শনীতে অংশ নিয়ে আমরা নিজেদের পণ্য স্থানীয় ও বিদেশী ক্রেতাদের কাছে তুলে ধরছি। এখানে যেহেতু বিক্রির সুযোগ নেই, তাই পণ্য সম্পর্কে ক্রেতাদের জানাচ্ছি। কেউ চাইলে সেটা আমাদের কোম্পানি থেকে সংগ্রহ করতে পারবে।’
এই এক্সপোয় সিরামিক ব্র্যান্ড ছাড়াও অংশ নিয়েছে এলপি গ্যাস ও মেশিনারিজ কোম্পানিও। দেশের অন্যতম এলপিজি ব্র্যান্ড ওমেরা পেট্রোলিয়াম লিমিটেডের কর্মকর্তা মাহমুদ এইচ খান বলেন, ‘তিতাস পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহ করতে পারছে না। সেই জায়গায় এলপিজি বিকল্প হিসেবে কাজ করছে। এখানে ওমেরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। সিরামিক শিল্পে আমরা গ্যাস সরবরাহ করে যাচ্ছি।’